১৯শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২০শে রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

ফটিকছড়িতে ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠির জন্য ছাগল প্যাকেজ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম

আবু মুছা জীবন ।। ফটিকছড়িতে ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠির জন্য প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের ছাগল প্যাকেজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কাগজে কলমে ছাগল বিতরণ প্যাকেজে সব কিছু বিতরণ দেখালেও বাস্তবে দেয়া হয়নি গুরুতপূর্ণ উপকরণ। এতে করে ছাগলের জন্য শেড নির্মাণ,খাদ্য, ফ্লোরমেড, কংক্রিটের পিলার বাবদ বরাদ্দকৃত বিপুল পরিমাণে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

সমতল ভূমিতে বসবাসরত অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আর্থসামাজিক ও জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে নেওয়া সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের ছাগল প্যাকেজে এমন অনিয়মের ফলে জনমনে নানা প্রশ্ন  দেখা দিয়েছে।

এই প্রকল্পে ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠির আর্থসামাজিক ও জীবনমান উন্নয়ন সরকারের মূল লক্ষ্য হলেও সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণে হতাশ হয়ে পড়েছেন ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠির হত দরিদ্র এসব মানুষ।

সরকারী তথ্যমতে দুই দফায় ২০০ উপকারভোগীর মধ্যে ৪০০টি ছাগল ও বিভিন্ন উপকরণ বিতরণ দেখানো হলেও সরেজমিনে ১৫ উপকারভোগীর তথ্য যাচাই করে মাস্টার রোলের সঙ্গে মাঠের বাস্তবতায় বেশ কিছু অমিল পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে উপকারভোগীদের নামে থাকা স্বাক্ষর নিয়ে। যাঁদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে, তাঁদের প্রায় সবাই দাবি করেছেন, মাস্টাররোলে থাকা স্বাক্ষর তাঁদের নয়।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আর্থসামাজিক ও জীবনমান উন্নয়নে এ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন প্যাকেজে প্রাণী ও উপকরণ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

ফটিকছড়িতে প্রকল্পের প্রথম দফায় ১০০ উপকারভোগীকে দুটি করে ছাগল, ২৫ কেজি খাদ্য, পাঁচটি করে ফ্লোর ম্যাট এবং ২ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়ার কথা। দ্বিতীয় দফায় আরও ১০০ জনকে দুটি করে ছাগল, ৫০ কেজি খাদ্য, পাঁচটি ফ্লোর ম্যাট, দুটি করে সি আই শিট ও চারটি করে কংক্রিট পিলার দেওয়ার কথা। প্রথম দফার বিতরণ হয় ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর এবং দ্বিতীয় দফা ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি।

সরকারি মাস্টাররোলে দুই দফায় ২০০ উপকারভোগীর নাম, পিতা বা স্বামীর নাম, মোবাইল নম্বর, ঠিকানা ও স্বাক্ষর রয়েছে। প্রত্যেকের পাশে নির্ধারিত উপকরণ পাওয়ার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু অনুসন্ধানে কথা বলা ১৫ উপকারভোগীই দাবি করেছেন, তাঁরা মাস্টাররোলে স্বাক্ষর করেননি। তাঁদের নাম ও পরিচয় ঠিক থাকলেও নিজেদের নামে থাকা স্বাক্ষর নিজেদের নয় বলে জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের মধ্যে মায়ালক্ষ্মী ত্রিপুরা, ললিন্দ্র ত্রিপুরা, কাঞ্চন কুমার ত্রিপুরা, মজিব ত্রিপুরা, সশিন্দ্র ত্রিপুরা, মাধুরী ত্রিপুরা, কাঞ্চন মালা ত্রিপুরা, নিরেন্দ্র ত্রিপুরা, সোনালক্ষ্মী ত্রিপুরা, সংগ্রাম ত্রিপুরা, শিবু কুমার ত্রিপুরা, মনিবালা ত্রিপুরা ও চাকষী ত্রিপুরা রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দাঁতমারার সোনারখীল ও পেলারখীল, নেপচুন এবং বাগানবাজার এলাকার বাসিন্দারা রয়েছেন।

দ্বিতীয় দফার ১৫ উপকারভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের মধ্যে ১২ জনের দুটি করে এবং তিনজনের একটি করে ছাগল মারা গেছে। অর্থাৎ এই ১৫ জনের পাওয়া ৩০টি ছাগলের মধ্যে ২৭টিই মারা গেছে।

নেপচুনের বাসিন্দা সংগ্রাম ত্রিপুরা, বাগানবাজারের শিবু কুমার ত্রিপুরা ও মনিবালা ত্রিপুরাসহ কয়েকজন জানান, ছাগল পাওয়ার সময় সেগুলো দুর্বল ছিল। কারও কারও ছাগল এক সপ্তাহের মধ্যেই মারা যায়। বিষয়টি তদারকি কর্মকর্তাকে জানানো হলেও পরে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের।

তবে মৃত ছাগলগুলোর কোনো ছবি, ভিডিও বা মৃতদেহ বর্তমানে পাওয়া যায়নি। ফলে মৃত্যুর কারণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

প্রকল্পের ছাগল প্যাকেজের সরকারি শর্ত অনুযায়ী, ছাগল নির্দিষ্ট জাত, বয়স, ওজন ও স্বাস্থ্যগত মানদণ্ড পূরণ করার কথা। উপকারভোগীদের কয়েকজনের দাবি, তাঁরা অপেক্ষাকৃত কম ওজনের ছাগল পেয়েছিলেন। তবে বিতরণের সময় ছাগলের ওজন মাপার স্বতন্ত্র কোনো রেকর্ড অনুসন্ধান দলের হাতে আসেনি।

প্রথম দফায় ১০০ উপকারভোগীকে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়ার কথা। এতে মোট অর্থের পরিমাণ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। মাস্টাররোলে এ অর্থ পাওয়ার তথ্য উল্লেখ থাকলেও যাচাই করা ১৫ জনের কেউ টাকা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেননি।

অধিকাংশ উপকারভোগী পাঁচটি ফ্লোর ম্যাট পাওয়ার কথাও নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে তাঁরা ২৫ কেজি খাদ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

এই ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা কীভাবে বিতরণ করা হয়েছে, তার পৃথক ভাউচার, রসিদ, ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনের হিসাব অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি।

দ্বিতীয় দফায় ১০০ উপকারভোগীর প্রত্যেককে দুটি করে সি আই শিট ও চারটি করে কংক্রিট পিলার দেওয়ার কথা। অর্থাৎ ২০০টি সি আই শিট এবং ৪০০টি কংক্রিট পিলার।

কিন্তু সরেজমিনে যাচাই করা ১৫ জনের কারও বাড়িতে এসব উপকরণ দিয়ে গৃহনির্মাণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। খাদ্যের ক্ষেত্রেও অমিল রয়েছে। কেউ ২৫ কেজি, আবার কেউ ৫০ কেজি খাদ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

এদিকে সরকারের দেয়া এসব ছাগল মারা যাওয়ার পর উপকারভোগিসহ আশপাশ এলাকার বাঙ্গালি অনেক পরিবারের প্রায় শতাধিক ছাগল মারা গেছে বলে জানান স্থানীয়রা।

মাস্টাররোলে সব উপকরণ বিতরণ দেখানো হলেও এসব উপকরণের ক্রয় ও সরবরাহের পৃথক বিল-ভাউচার বা চালান অনুসন্ধান দলের হাতে দেওয়া হয়নি।

সরকারি শর্ত অনুযায়ী বিতরণ করা ছাগল স্বাস্থ্যবান, রোগমুক্ত ও টিকাদানকৃত হওয়ার কথা। কিন্তু যাচাই করা উপকারভোগীদের কারও কাছে ছাগলের টিকা কার্ড পাওয়া যায়নি। ছাগলের স্বাস্থ্য সনদ বা টিকাদানের রেকর্ডও সংশ্লিষ্ট কার্যালয় দেখাতে পারেনি।

ছাগল বিতরণের সময়কার স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ওজন ও টিকাদানের তথ্য সংরক্ষণ করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও কোনো পৃথক নথি পাওয়া যায়নি।

উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবদুল মমিন এর দাবি, সব আইটেম দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “অভিযোগ দিতেই পারে। আমরা সবগুলো আইটেম প্রদান করেছি। ছাগলগুলো সুস্থ-সবল ছিল।”মাস্টাররোলে থাকা স্বাক্ষর উপকারভোগীদেরই বলে দাবি করেন তিনি।

ছাগল মারা যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, উপকারভোগীদের পরিচর্যার ঘাটতি ও পরিবেশগত সমস্যার কারণে ছাগল মারা যেতে পারে। তাঁর ভাষায়, এটি ‘লস প্রজেক্ট’; বিভিন্ন জায়গায় ছাগল মারা যাচ্ছে।

তবে ছাগল মারা যাওয়ার পর কোনো উপকারভোগীর বাড়িতে গিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে কিনা কিংবা মৃত ছাগলের পরিবর্তে নতুন ছাগল দেওয়া হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে কোনো নথি অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি।

প্রকল্পটির উদ্দেশ্য যেখানে অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর আর্থসামাজিক ও জীবনমানের উন্নয়ন, সেখানে ৪০০টি ছাগল এবং সংশ্লিষ্ট উপকরণ বিতরণের হিসাব নিয়ে মাঠপর্যায়ে এমন অমিল কেন—এ প্রশ্ন উঠেছে।

এদিকে উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তার বক্তব্য এবং  মাষ্টাররোল অনুযায়ী কাগজে কলমে সবকিছু ঠিকমত বিলি করা হয়েছে দাবী করলেও প্রকল্পের সমন্বয়কারী থোয়াইনিং মার্মা বলেন, ছাগলের শেড নির্মাণের টাকা এখনো বরাদ্দ আসেনি। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা এবং ছাগল বিতরণের সমন্বয়কারীর পরস্পর বিরোধী বক্তব্যে দেখা দিয়েছে নানা রহস্য।

এদিকে এই প্রকল্পের সরকারী প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী উপকারভোগিদের মাঝে ছাগল বিতরণকালে বিতরণ কমিটির সভাপতিসহ স্থানীয় সাংসদ, জনপ্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকর্মীদের জানানোর নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হয়নি।

মাস্টাররোলে ২০০ উপকারভোগীর নামে সব উপকরণ পাওয়ার তথ্য রয়েছে। কিন্তু যাচাই করা উপকারভোগীদের বক্তব্যে তার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে তাঁদের নামে থাকা স্বাক্ষর নিয়েও রয়েছে গুরুতর প্রশ্ন।

তাহলে উপকারভোগীরা স্বাক্ষর না করলে মাস্টাররোলে থাকা স্বাক্ষর কার? প্রথম দফার ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা কীভাবে বিতরণ করা হলো ? ২০০টি সি আই শিট ও ৪০০টি কংক্রিট পিলার কোথায় সরবরাহ করা হলো ? আর ৪০০টি ছাগলের স্বাস্থ্য ও মান কীভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিল ?

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, সরকারী যে কোন প্রকল্প বাস্তবায়নে নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। নীতিমালার বাইরে গিয়ে কোন কিছু করার সুযোগ নেই। তাছাড়া ছাগল বিতরণের বিষয়টি তাঁকে জানানো হয়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা মো. আলমগীর বলেন, ছাগল বিতরণে কোন ধরনের অনিয়ম হলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রকল্পের ক্রয়সংক্রান্ত নথি, বিল-ভাউচার, সরবরাহ চালান, অর্থ বিতরণের হিসাব, ছাগলের স্বাস্থ্য ও টিকাদানসংক্রান্ত রেকর্ড এবং মাস্টাররোলে থাকা স্বাক্ষর যাচাই করা জরুরি বলে মনে করেন স্থানীয় সচেতন মহল।

ডেস্ক/জেএম/জিবি

128 Views

শেয়ার করুন:

Facebook
WhatsApp

সার্চ করুন........